Advertisement

ফিরে দেখা সেইসব দিনগুলো, যেগুলো আমাদের ছোটবেলা ভরিয়ে রাখত

শুক্রবার, ২ এপ্রিল, ২০২১

চেনা গানের অজানা কথা ৬

 

 তার আর পর নেই -  নেই কোন ঠিকানা

তারপর ?

‘তার আর পর নেই -  নেই কোন ঠিকানা’

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ঐশ্বরিক কণ্ঠে সেই বিখ্যাত গান সংগীতপাগল মানুষ অনেকেই শুনেছেন বিশেষত ওই গানে বিভিন্ন জায়গায় ‘তারপর’ বলে এক আশ্চর্য কণ্ঠী মহিলার কণ্ঠ, বিভিন্ন মদ্যুলেশন-এ ব্যবহৃত এই সংলাপটি যেন যেটা কিছুটা রোমান্টিক এবং কিছুটা বিষণ্ণ 

অন্তরা, সঞ্চারীর আগেও সেই ‘তারপর’ প্রশ্ন সংলাপ ভেসে উঠতে থাকে এবং সেই সঙ্গে গানটা হয়ে উঠতে থাকে এক অলীক স্বপ্নের মতো । শুধু একটি মাত্র সংলাপ  কি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় সেই গানটিকে ।  বলতে পারেন গানের সেই ‘তারপর’ সংলাপটি কার ?

অবশ্যই বলব তার আগে একটু ভূমিকা যে প্রয়োজনীয় । 

সেবার একটি বিশেষ কাজে বোম্বাইতে সুরকার নচিকেতা ঘোষ এসেছেন।  একদিন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাথে এক ঘরোয়া আড্ডায় হেমন্তবাবু নচিকেতাবাবুকে জানালেন, ‘গত বছর পুজোয় আমি সলিলের (সলিল চৌধুরী) কথায় ও সুরে গান গেয়েছি।  এই বছরের গানে একটা নতুন কিছু চমক দাও, যেটা আগে কখনো আমার গানে আসেনি'। সুরকার নচিকেতা ঘোষ চিরকালই গানের সুর নিয়ে একটু এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালবাসেন ।  সম্প্রতি তিনি এক পরিচিতের মারফত খবর পেয়েছেন বিখ্যাত পরিচালক বিমল রায়ের সেক্রেটারি কাম সহকারী খড়গপুরের ছেলে মুকুল দত্ত খুব ভালো লেখেন । বিমল রায়ের ‘কাবলিওয়ালা’, ‘বন্দিনী’ ইত্যাদি ছবিতে তিনি বিমল রায়কে খুব ভালভাবে অ্যাসিস্টও  করেছেন । নচিকেতা ঘোষের সাথে আলাপ হবার পর মুকুল একটা গান লেখার প্রস্তাব পেলেন । কিন্তু তখন মুকুল দত্ত প্রচণ্ড ব্যস্ত লোক । তিনি প্রথমে প্রত্যাখ্যান করলেন পরে যখন শুনলেন গানটি গাইবেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তখন আর না করতে পারলেন না মুকুলবাবু ।   নচিকেতা ঘোষ তখন গানের একটা নাটকীয় বিষয় বুঝিয়ে দিলেন । 

গীতিকার মুকুল দত্ত


                    

লেখা হোল সেই বিখ্যাত গান ---  ‘তারপর ? তার আর পর নেই -  নেই কোন ঠিকানা’ ।

কিন্তু গানের সেই বিখ্যাত ‘তারপর’ সংলাপটি কে বলবেন !  ইতিমধ্যেই নচিকেতা ঘোষের সাথে আলাপ হয়ে গেছে বলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী চাঁদ উসমানীর। উনি তখন মুকুল দত্তের ঘরণী ।  দিলীপ কুমারের বিখ্যাত ছবি ‘নয়া দৌড়’, ধর্মেন্দ্রর ‘হকিকত’, অমিতাভের ‘অভিমান’, শাম্মি কাপুরের ‘জীবন জ্যোতি’ বিশ্বজিৎ ও সায়রা বানু জুটির বিখ্যাত ছবি ‘এপ্রিল ফুল’, কিশোর কুমারের ‘বাপ রে বাপ’ সহ অজস্র বিখ্যাত সিনেমার অন্যতম মুখ তিনি ।  পাশাপাশি স্বামী মুকুল দত্তের ঘরণী হবার দৌলতে চাঁদ উসমানীর বাংলা উচ্চারণও খুব স্পষ্ট তখন  অতঃপর সুরকারের অনুরোধে মুকুল ঘরণী ‘তারপর’ সংলাপটি হেমন্তবাবুর গানের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন মুডে রেকর্ডিং করলেন ।   

১৯৫৩ সালের ছবি ‘জীবন জ্যোতি’ র একটি দৃশ্যে চাঁদ উসমানী ।

অন্তরা, সঞ্চারীর আগেও সেই ‘তারপর’ প্রশ্ন সংলাপ ভেসে উঠতে লাগলো এবং সেই সঙ্গে গানটা হয়ে উঠল এক অলীক স্বপ্নের মতো । রেকর্ডিং শেষ হবার পর সবাই অনুভব করলেন শুধু একটি মাত্র সংলাপ কি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সেই গানটিকে ।  হেমন্তবাবু নিজেও খুব আনন্দিত রেকর্ডিং শেষ হবার পর।  ১৯৬২ সালে পুজোয় রিলিজ হওয়া সেই গানটি সেই বছর সুপার হিট বাংলা গানের তালিকায় জায়গা করে নিল এবং বলাই বাহুল্য আজও গানটি সমান জনপ্রিয় ।  এই রেকর্ডের উল্টোদিকের গানটিও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, 'তুমি এলে অনেকদিনের পরে যেন বৃষ্টি এল', এই গানের কথাও লিখেছিলেন মুকুল দত্ত ও সুর দিয়েছিলেন নচিকেতা ঘোষ।

অভিনেত্রী নূতনের সাথে মুকুল পুত্র রোশন ও চাঁদ উসমানী

 

শেষ করার আগে আরও একটা ছোট্ট তথ্য দিয়ে দিই । বাংলা গানে এই রকম এক সংলাপ বিখ্যাত হয়ে রয়েছে আরও একটি কালজয়ী গানে।  সেখানে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারীর আগে প্রশ্ন ছিল আর এক নারী কণ্ঠে । ‘এ কি আকাশ?’ , ‘এই কি সাগর?’ ।

তালাত মাহমুদ যিনি বাংলায় তপনকুমার নামে গাইতেন

রাখী গুলজার (বিশ্বাস)


সেই কণ্ঠ ছিল আর এক বলিউড অভিনেত্রী রাখী গুলজারের । এই গানে সুর দিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর এই গানের কথাও লিখেছিলেন মুকুল দত্ত ।  আর হেমন্তবাবু
গানটি গাইয়েছিলেন তপনকুমারকে দিয়ে ।  আর কে না জানে বোম্বাইয়ের বিখ্যাত গায়ক তালাত মাহমুদ বাংলায় গান গাইতেন ‘তপনকুমার’ নাম নিয়ে । গানগুলির লিংক দিয়ে দিলাম। কেমন লাগলো জানালে আমার বেশ ভালো লাগবে আর এর সাথে ইচ্ছে রইল
আগামী কোন এক দিন অভিনেত্রী চাঁদ উসমানীকে নিয়ে কিছু লেখার । 


                  তার আর পর নেই -  নেই কোন ঠিকানা

   

তুমি এলে অনেকদিনের পরে যেন বৃষ্টি এলো

 

                           এ যদি আকাশ হয় তোমায় কি বলে আমি ডাকব ?

 

প্রবীর মিত্র

০৩/০৪/২০২১

(বিশেষ তথ্যঋণ ঃ জয়দীপ চক্রবর্তী, এই সময়, দেশ ও সব ছবি এবং ভিডিও ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত)  


সোমবার, ২২ মার্চ, ২০২১

চেনা গানের অজানা কথা ৫

 

 কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল

১৯৫৩ সালের কোন একটা সময়ে মুম্বাইয়ের একটা রেকর্ডিং স্টুডিয়ো ফ্লোরে বেশ একটা টান টান উত্তেজনা। লতা মঙ্গেশকর আসবেন তাঁর জীবনের প্রথম বাংলা আধুনিক গানের রেকর্ডিং-এর জন্য, যেটা সেই বছর পূজোতে রিলিজ করবে।  গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারও উপস্থিত আছেন ফ্লোরে। তিনি বেশ চিন্তিত। লতার মতো একজন ব্যস্ত শিল্পীকে দিয়ে রেকর্ডিং করা বেশ দুরূহ কাজ।  গানের সুরকার,  মিউজিসিয়ানদের নানারকম নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে কোন রকম ভুলচুক না হয় কারণ লতাজি খুব ব্যস্ত একজন শিল্পী। সময় বয়ে যায় কিন্তু তাঁর যে দেখা নেই।  কিছুদিন আগেই লতাজিকে গানটি পুরো তুলিয়ে দিয়েছেন সুরকার।  আজ ফাইনাল রেকর্ডিং–এর দিন।  সব কিছু রেডি কিন্তু লতাজি যে এখনো এসে পৌঁছলেন না।   অবশেষে দিনের শেষে লতাজি খবর পাঠালেন অন্য একটি জরুরী রেকর্ডিং-এর কাজ পড়ে যাওয়ায় তিনি সেই দিন উপস্থিত থাকতে পারলেন না। অনুগ্রহ করে লতাজিকে অন্য কোনদিন যেন ডেট দেওয়া হয়।  

পরবর্তী ডেট-এও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোল।  এবার সুরকার গেলেন রেগে। তিনি অত্যন্ত অপমানিত বোধ করলেন।  তিনি তো আর এলেবেল লোক নন। তাঁর রক্তে আছে একটা সাংগীতিক ঘরানা।  ইতিমধ্যেই এই সুরকার ছবিতে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসাবেও যথেষ্ট নাম করেছেন। গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার বোঝালেন লতাজি খুবই ব্যস্ত মানুষ হয়তো আগের মতোই তিনি আবার কোন সাংগীতিক ক্রিয়া কর্মে জড়িয়ে গেছেন, তাছাড়া এই লাইনে এইসব আকছার হয়।  কিন্তু তিনি এইসব যুক্তি মানতে চাইলেন না।  তিনি একসময় গোবর গুহর কুস্তির আখড়ায় তিনি রীতিমত শরীরচর্চা করতেন।  শারীরিক দিক ছাড়াও মানসিক দিক থেকেও তিনি যথেষ্ট বলিষ্ঠ।  শুধু তাই নয়, কয়েকবছর আগে  স্বয়ং লতাজীই সেই সুরকারকে বলেছিলেন তাঁর  বাংলা গানের প্রতি ভালোবাসার কথা এবং ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন তাঁর সুরে ও গৌরীবাবুর লেখায় তিনি তাঁর জীবনের প্রথম বাংলা আধুনিক গান রেকর্ড করতে চান।  ঠিক করলেন লতাজিকে বাদ দিয়েই অন্য কাউকে দিয়ে গাওয়ানো হবে গৌরীবাবুর লেখা এই দুটি গান।    রেকর্ড কোম্পানির এক কর্তা সেই সুরকারকে প্রস্তাব দিলেন তাহলে এই দুটি গান কোন ফিমেল ভয়েসে নয়, মেল ভয়েসে রেকর্ডিং হবে । আর সেটার গায়ক যদি স্বয়ং সুরকার হয় তাহলে রেকর্ড কোম্পানির তেমন কোন লোকসান হবে না, তাছাড়া সেটিই হবে সেই বাঙ্গালী গায়ক ও সুরকারের রেকর্ডেড প্রথম বাংলা আধুনিক গান।  গীতিকার গৌরীপ্রসন্নও এই প্রস্তাবে একমত হলেন।  অবশেষে রেকর্ড হোল ১৯৫৩ সালের পূজোয় রিলিজ হওয়া সেই দুটি কালজয়ী গান।  ‘কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল’ এবং ‘হায় হায় গো রাত যায় গো’।  দ্বিতীয় গানটির সুরের ব্যাপারে সেই সুরকার জানিয়েছিলেন যে গানটিতে একটি ইংরেজি গানের কিছুটা সুরের ছোঁয়া আছে, যেটি উনি শিখেছিলেন তাঁরই দক্ষিণভারতীয় স্ত্রীর কাছে।  ‘I was dancing with my darling’ – গানটি একদিন গুনগুন করে গাইবার সময় গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন বলেছিলেন এই সুরের উপর তিনি গান লিখবেন। লিখেছিলেন এই গানটি , ‘হায় হায় গো রাত যায় গো’।  জানি, ইতিমধ্যেই আপনারা বুঝে ফেলেছেন যে সেই গায়ক ও সুরকারের নাম।  একদম ঠিক, তিনি প্রবোধ চন্দ্র দে,  অর্থাৎ  আমাদের প্রিয় শিল্পী মান্না দে।  আর এই দুটি গানের অর্কেস্টেশন করেছিলেন ভি বালসারা।  সেই সময় বালসারাজি মুম্বাই-এ শঙ্কর জয়কিশেন প্রায় প্রত্যেক ছবিতে হারমোনিয়াম বাজাতেন এবং তিনি  এইচ  এম ভি-এর সাথে যুক্ত ছিলেন।  গানদুটি হিট হওয়ায় এইচ এম ভি-এর প্রত্যয় হোল যে এই মান্না নামের ছেলেটি তাঁর কাকার যোগ্য উত্তরসূরী। এর পর থেকে প্রায় প্রত্যেক বছর এইচ এম ভি-এর পূজোর গানের তালিকায় মান্না দে-র নাম থাকত সংগীতশিল্পী হিসাবে। এই গৌরীপ্রসন্ন-মান্না দে জুটিই আমাদের উপহার দিয়েছে দুর্দান্ত কিছু বাংলা আধুনিক গান যেমন, ‘তীর ভাঙ্গা ঢেউ আর নীড় ভাঙ্গা ঝড়’, ‘তুমি আর ডেকো না, পিছু ডেকো না’ এবং অবশ্যই জনপ্রিয় ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ (সুরঃ সুপর্ণকান্তি ঘোষ)।    

মান্না দে ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার
শেষ করার আগে আরও একটা তথ্য দিয়ে রাখি, এর ঠিক কয়েকবছর পর শিল্পী ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে গাওয়ালেন লতাজীর জীবনের প্রথম আধুনিক বাংলা গান পুজোর জন্য।  ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে’, আর এই গানের কথাও লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।  ১৯৫৭ সালে রিলিজ হওয়া এই গানও খুব হিট করেছিল।    আর এর ঠিক কয়েকবছর পর অর্থাৎ ১৯৬১ সালে হেমন্তবাবু এই গানের সুর ব্যবহার করলেন তাঁরই সুরারোপিত একটি হিন্দী ছবিতে। গানের কথা লিখলেন সাহির লুধিয়ানভি এবং ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে’ এই গানের হিন্দী ভার্সনটি গাইলেন কিশোর কুমার। বলা বাহুল্য এই ছবিতে কিশোর ছিলেন নায়ক ও নায়িকা ছিলেন ওয়াহিদা রেহমান। ছবির নাম ‘গার্লফ্রেন্ড’।   

             

 

                                                         কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল 

 

                                                       হায় হায় গো রাত যায় গো

                                                      প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে 

 

                                       ‘গার্লফ্রেন্ড’ ছবির সেই গান যেটি গেয়েছিলেন কিশোর কুমার

 

বিশেষ ঋণঃ ফিল্মফেয়ার পত্রিকা, সুরসম্রাট মান্না দে – সংকলন ও সম্পাদনা – মানস চক্রবর্তী  

প্রবীর মিত্র

২৩/০৩/২০২১