Advertisement

ফিরে দেখা সেইসব দিনগুলো, যেগুলো আমাদের ছোটবেলা ভরিয়ে রাখত

রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

চেনা গানের অজানা কথা ৪

 সে আমার ছোট বোন, 

বড় আদরের ছোট বোন

ঘটনার সময়কাল ১৯৭৭ সাল। উত্তর কোলকাতার মদন ঘোষ লেনের বাড়ীতে শিল্পী মান্না দে-র রেওয়াজ ঘরে বসে ১৭ বছরের তরুন সুপর্ণকান্তি ঘোষ।  তার আগের বছরেই চলে গিয়েছেন বাবা কিংবদন্তী সুরকার নচিকেতা ঘোষ।  সাংবাদিক অজয় বিশ্বাস ছিলেন সুরকার নচিকেতা ঘোষের প্রিয় বন্ধু ও প্রতিবেশী।  নচিকেতাবাবু মারা যাবার পর যুবক সুপর্ণকান্তি বাবার হারমোনিয়াম নিয়ে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ইত্যাদি গীতিকারের লেখায় সুর তুলতেন, যেগুলি তাঁর বাবা বাতিল করে দিয়েছিলেন। এটা তাঁর কাছে একটা শখের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।  একদিন অজয়বাবু নচিকেতা ঘোষের বাড়ীর পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনলেন কে যেন গান গাইছে। ঘরে ঢুকে দেখলেন হারমোনিয়াম নিয়ে একমনে গান গাইছেন নচিকেতা ঘোষের সুপুত্র।  গান শুনে তো অজয়বাবু মুগ্ধ।  এর কিছুদিন পর  একই বিমানে বোম্বাই যাবার পথে মান্না দে-র সাথে অজয়বাবুর দেখা। একথা সেকথার পর অজয় বিশ্বাস জানালেন যুবক সুপর্ণকান্তির সুরসৃষ্টির কথা। মান্নাবাবু নচিকেতা ঘোষের ছেলে খোকাকে (সুপর্ণকান্তি ঘোষ-এর ডাকনাম) চিনতেন এবং খুব স্নেহও করতেন কারণ বেশ কিছু গানের রেকর্ডিংএ বাবার সঙ্গীত পরিচালনায় সুপর্ণকান্তি বংগো বাজাতেন, কিন্তু ও যে সুর করছে সেটা মান্নাবাবুর জানা ছিল না।  কিছুদিন পর তিনি সুপর্ণকান্তিকে ডেকে পাঠান তাঁর উত্তর কোলকাতার বাড়ীতে। রেওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে মান্নাবাবু সুপর্ণকান্তির সঙ্গে আলাপচারিতা করছিলেন।  নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন সুপর্ণকান্তিকে। বাবার মতো আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’।  সুপর্ণকান্তির নিজের সুরের কিছু গানও শুনলেন। বুঝলেন এই ছেলের দম আছে।  গান শোনার পর সেইদিন মান্নাবাবু তাঁর আদরের খোকার হাতে তুলে দিলেন একটা খাম যার ভিতরে একটি চিরকুটে লেখা আছে একটা গানের কটা লাইন, যেটাতে সুর বসাতে দায়িত্ব দিলেন

সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ

স্বয়ং মান্না দে তার সাথে এটাও জানিয়ে দিলেন যে এই গান আরও একজন সুর করেছেন ইতিমধ্যে, যদি খোকার করা সুর মান্নাবাবুর পছন্দ হয় তাহলে তিনি পরের পুজোয় এই গান রেকর্ডিং করবেন।  বেশ গুরুদায়িত্ব, কিন্তু সেইদিনই সুর বসানোর কাজ শুরু হয়ে গেল মান্না দে-র উত্তর কোলকাতার বাড়ীর বাইরে বেরনোর সাথে সাথে।  উত্তর কোলকাতার হেদুয়া থেকে দক্ষিণ কোলকাতার হাজরা মোড় যাবার পথে দোতলা ২বি বাসে চেপে বসলেন, সুপর্ণকান্তি। দুপুরবেলা, বাসের দোতলা মোটামুটি ফাঁকা।  বুক পকেটে রাখা খাম থেকে চিরকুটটা ভালো করে চোখ বুলোতেই বুঝতে পারলেন হাতের লেখা বরেন্য গীতিকার পুলক বন্দোপাধ্যায়ের, কারণ বাবার সংগীত পরিচালনার দৌলতে উনি এই হাতের লেখার সাথে অনেকদিন আগেই পরিচিত।   

                           ‘মার স্নেহ কাকে বলে জানিনা,

                            বাবার মমতা কি বুঝতে না বুঝতে

                            এ বিরাট পৃথিবীতে দেখলাম

                            সে ছাড়া আমার আর কেউ নেই

                            সে আমার ছোট বোন, বড় আদরের ছোট বোন’।  

 এই কটা লাইন বাসে বসেই গুনগুন করতে করতে সুর করে ফেললেন সুপর্ণকান্তি। বাড়ীতে এসেই হারমনিয়ামে তুলে নিলেন সুরটা।   কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো গানের সুর রেডি।  আবার সুপর্ণকান্তি এলেন তাঁর মানাকাকুর উত্তর কোলকাতার বাড়ীতে।  মন দিয়ে গানের সুরারোপ শুনলেন মান্না দে।  গানের শেষে ঘরে যেন পিন পড়ার শব্দ শুনতে পারা যাবে এমন নিস্তব্ধতা।  সুপর্ণকান্তি লক্ষ্য করলেন তাঁর মানাকাকুর চোখে জল।  তারপর সামলে নিয়ে বললেন, “খোকা তোমার সুরের এই গান আমি গাইব”।  একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে উঠা মান্নাবাবু তাঁর মা-এর পাশাপাশি একমাত্র বোন বীণাপানিকেও খুব ভালোবাসতেন। মা-কে নিয়ে অসংখ্য গান রয়েছে তাঁর‌ কিন্তু বোনকে নিয়ে যে এমন গান হতে পারে তার সাথে এমন সুর, সব দিক থেকেই যেন একটু বৈচিত্র বহন করছে। 

'সে আমার ছোট বোন' গানের রেকর্ডিং-এ  বামদিক থেকে গানের সুরকার সুপর্ণকান্তি, গায়ক মান্না দে ও গীতিকার পুলক বন্দোপাধ্যায়

অবশেষে রেকর্ড হল ১৯৭৮ সালের পুজোর গান,  পুলক বন্দোপাধ্যায়ের লেখা ও সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুর করা মান্না দে-র সেই কালজয়ী গান, সে আমার ছোট বোন, বড় আদরের ছোট বোন’ যা সুরকার হিসাবে সুপর্ণকান্তি ঘোষকে প্রথম পরিচিতি এনে দিয়েছিল।  এই গানের রেকর্ডের অপরপিঠে ছিল আরও একটি দুর্দান্ত গান, ‘এ নদী এমন নদী, জল চাই একটু যদি, দুহাত ভরে উষ্ণ বালুই দেয় আমাকে’, এই গানের কথাও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন কিন্তু সুর দিয়েছিলেন প্রভাস দে, সুপর্ণকান্তি নন।

 'সে আমার ছোট বোন’ গানটি রিলিজের পর সবার মনে ধারনা হল, এমন সুর কি সুপর্ণকান্তির মতো একটা নবাগত সুর করতে পারে? এ নিশ্চই বাবা নচিকেতা ঘোষের করে যাওয়া কোন সুর, ছেলে সেটা নিজের বলে চালাচ্ছে।  এটা খুবই পরিতাপের বিষয় যে জীবনের প্রথম সুর করা গানের সাথে বেশ কিছু অর্বাচীন ব্যাক্তি যারা নচিকেতা ঘোষের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরা সুপর্ণকান্তিকে তাঁর বাবার সাথে গুলিয়ে ফেলেছিলেন।  এমনকি রেকর্ডিং – এর আগে গানের গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানতেন না তাঁর এই গানের সুর দিচ্ছে একজন নবাগত।  যখন জানলেন, পুলকবাবু প্রবল আপত্তি জানালেন মান্নাবাবুকে। কিন্তু মান্না দে তাঁর সিদ্ধান্তে

অটল, তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিলেন খোকার সুর ছাড়া এই গান তিনি গাইবেন না।  গান রিলিজের পর এই গান সাংঘাতিক হিট হোল কিন্তু প্রচারবিমুখ সুপর্ণকান্তি সেভাবে পরিচিত হলেন না, আসলে তিনি মানুষটাই এমন, কারণ আর এক দাপুটে সুরকার নচিকেতা ঘোষের রক্ত বইছে তাঁর ধমনীতে তাই যেন তিনি নিজেকে একটু অভিমানের সঙ্গেই আড়াল রাখলেন।  এর কয়েকবছর পর, সুপর্ণকান্তির মানাকাকা আবার ডাকলেন তাঁকে এবং এবার দিলেন পুলক বন্দোপাধ্যায়ের লেখা বিভিন্ন আঙ্গিকের সাত সাতটি গান এবং গানগুলোর সুর করার ভার দিলেন।  ১৯৮০ সালে এইচ এম ভি থেকে রিলিজ হোল মান্না দে-এর ‘সারা জীবনের গান’ নামক একটি লং প্লে রেকর্ড।  

প্রত্যেকটি গান একেবারে বাম্পার হিট।  গানগুলির থিমও খুব মোহময়। মা, শৈশব, ভালোবাসা, যৌবন, পরিবার, জীবন এবং রেকর্ডের শেষ গান অবশ্যই আবার মা-কে নিয়ে।    প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা ভালো, পুলকবাবুর গানের কথায় থাকত এক একটা সম্পর্কের ছবি। যেমন ভাইবোন-এর সম্পর্ক ছাড়াও বাবা-মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে লেখা গান ‘আয় খুকু আয়’ (গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তি মজুমদার),  মা-মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে লেখা গান ‘তুমি আমার মা, আমি তোমার মেয়ে’ (গেয়েছিলেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তি মজুমদার)। অবশ্য আমরা এর আগেই শুনে ফেলেছি, প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের গাওয়া সেই কালজয়ী গান, যেটারও থিম ছিল ভাই-বোনের সম্পর্ক, ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর, চাঁদ উঠেছে ওই’, কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচির কথায় এই গানের সুর দিয়েছিলেন, সুধীন দাশগুপ্ত।         

সুপর্ণকান্তির একটা সাক্ষাৎকারে জানা যায়, তাঁর মায়ের পরেই নিজের দুই ছোটবোন, শ্রাবণী ও সম্পূর্ণা সুপর্ণকান্তির জীবনে খুব বড় একটা ভূমিকা নিয়েছে।  তাই জীবনের প্রথম গানটিই তিনি তাঁর দুই বোনকে উৎসর্গ করেছিলেন।  আগেই বলেছি একমাত্র বোন বীণাপানিকেও খুব ভালোবাসতেন মান্না দে। তাই গানের মধ্যে দাদার, বোনের প্রতি আকুতি আজও গানটি শুনলে ধরা পড়ে কানে এবং পাশাপাশি চোখে জল এনে দেয়।  স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসার এক অসামান্য মেলবন্ধন এই গানটি।

 

 
 
সে আমার ছোট বোন, বড় আদরের ছোট বোন...। 
 

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ- সুপর্ণকান্তি ঘোষের নানারকম সাক্ষাৎকার ও রুপায়ন ভট্টাচার্য (এই সময়)।   

 

প্রবীর মিত্র

০৭/০২/২০২১ 


মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

সংগীতের কিংবদন্তী

 বড় সাধ জাগে একবার তোমায় দেখি

 

[গত ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২০ ছিল গানের প্রতিমার ৮৬ তম জন্মদিন।  শিল্পী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংগীতবহুল জীবনের কিছু কথা, আজ অন্তিম পর্ব।  প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন ]


গত পর্বের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের ছবিতে গাওয়া নানা ধরনের গান। আজ এই পর্বে চেষ্টা করছি ওনার বাংলা আধুনিক গান ও অন্যান্য গান নিয়ে কিছু লেখার।  আগেই লিখেছিলাম প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম বেসিক গানের রেকর্ড ১৯৪৫-৪৬ সাল নাগাদ প্রকাশিত হয় সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি থেকে কুমারী প্রতিমা চ্যাটার্জি  নামে । সুকৃতি সেন-এর সুরে গান দুটি ছিল ‘প্রিয় খুলে রেখো বাতায়ন’ ও ‘প্রিয় মালাখানি দিয়ে’।  এরপর বেশ কিছু বছর বিরতি নিয়ে ১৯৫২ সালে এইচ এম ভি –এর ব্যানারে প্রতিমা গাইলেন ‘হায়, আমার যে ঘর ছিল, হায়রে কে তা কেড়ে নিল’।  রেকর্ড কভারে মোহিনী চৌধুরীর লেখা এই দীর্ঘ গানটির উল্লেখ ছিল ‘শিল্পী প্রতিমার গাওয়া একটি বাস্তবগীতি’।  কে বলতে পারে এই বাস্তবগীতিই হয়তো বা অনেকপরের জীবনমুখী গান।

প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়

‘আমার সোনা চাঁদের কণা’ গানটি একসময় গ্রামবাংলার মায়েদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।  নিজের বাচ্ছাকে আদর করতে করতে অনেক মা-ই এই গানটি গুনগুন করে গাইতেন একটা সময়। ১৯৫৩ সালে রিলিজ হওয়া এই গানটির কথা লিখেছিলেন প্রনব রায় ও সুর দিয়েছিলেন নিতাই ঘটক । অপত্য স্নেহ প্রতিমার গলায় যেন মধু হয়ে ঝরেছিল এই গানের মধ্য দিয়ে। ১৯৫৫ সালে সলিল চৌধুরী গাওয়ালেন, ‘নাও গান ভরে নাও প্রাণ ভরে’ । এই গানের মধ্যে সলিলবাবুর গানে ব্যবহৃত সেই সময়কার খুব পরিচিত কয়েকটি বিশেষণ যেমন – সোনার ধানের শিষ, প্রান্তর, ঝির ঝির বাতাস , ঝিঁঝিঁ ডাকা দুপুর, সোনা রঙ আকাশের বর্ণনা, পল্লীবধূর কঙ্কণ শব্দ ইত্যাদি খুব সুন্দরভাবে লিখেছিলেন মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় যা প্রতিমার গলায় একেবারে যথাযথ আর বলাই বাহুল্য গানের সুরকার সলিল চৌধুরী।   এই গানের জনপ্রিয়তার উপর ভর করে ১৯৫৬ সালে ‘দিয়ালি কি রাত’ ছবিতে তালাত মেহমুদ গাইলেন, ‘ইয়ে খুশী কা সামা’ যার মুখরাটা তিনি নিয়েছিলেন প্রতিমার এই গানটি থেকে। গানের সুর দিয়েছিলেন স্নেহাল ভাটকর। 


           

সুধীন দাশগুপ্তের সুরে প্রতিমা বেশ কিছু গান গেয়েছিলেন তার মধ্যে আজও এক নম্বরে ‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই’।  আমার ব্যক্তিগত মতে এটা প্রতিমাদেবীর একটা অমরগীতি, এক দিদিকে খুঁজে চলা এবং সেই অনন্ত খোঁজ শেষ না হবার একটা উপখ্যান বা কাব্যসঙ্গীত।  তখন ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’, ‘রানার’ বা ‘পাল্কীর গানের’ মতো কাব্যসঙ্গীত হাতে গোনা। পঞ্চাশের দশকে কবির কবিতায় সুরারোপের যে ধারা চলছিল সেটা মাথায় রেখে সুরকার সুধীন দাশগুপ্ত কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর একটি কবিতা বেছে নিলেন।  গানটি প্রতিমা পর পর দুই বার রেকর্ডিং করছিলেন ।  দ্বিতীয়বার রেকর্ডিং –এ আসে নতুন যন্ত্রানুসঙ্গ কিন্তু গানের ভঙ্গিমা অবিকল সেই প্রথমে করা রেকর্ডিং এর মতো। ‘মাগো আমার শোলোক বলা কাজলাদিদি কই?’ – এই খোঁজের আর্তি আজও প্রত্যেক সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের চোখে জল এনে দেয়।  গান প্রকাশের বেশ কিছুদিনের মধ্যে প্রতিমার বাড়ীতে আসতে থাকল ফ্যান লেটার। এতদিন যেটা হয় নি, বিভিন্ন জায়গায়, অনুষ্ঠানে বা জলসায় প্রতিমার সই নেবার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।  প্রত্যেকটা জলসায় প্রতিমাকে গাইতে হল সেই মর্মস্পর্শী গানখানি।  আরও একটি গান মনে পড়ছে লিখতে গিয়ে, ‘এ

সুরের প্রতিমা

পারে গঙ্গা ও পারে গঙ্গা মধ্যিখানে চর, ভাস্কর বসুর কথায় এই গানেরও সুর দিয়েছিলেন সুধীনবাবু, গানের একটা লোকায়ত মেজাজকে গলার মধ্যে ধরেছিলেন প্রতিমা।   সুধীন দাশগুপ্তের সুরে আরও বেশ কয়েকটি বেসিক গান প্রতিমার কণ্ঠে বেশ হিট করেছিল, ‘একটা গান লিখো আমার জন্য’, ‘সাতরঙা এক পাখী’, ‘নিভে যা রাত নিভে যা’, ‘প্রেম শুধু এক মোমবাতি’, তোমার দেয়া অঙ্গুরীয়’ ইত্যাদি সব কালজয়ী গান।    

গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা অনুযায়ী ১৯৫৭ সালে তাঁর লেখা প্রথম বেসিক গান প্রতিমাদির গাওয়া, সুরকার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।  গানটি ছিল, ‘তোমার দুচোখে আমার স্বপ্ন আঁকা’।   অভিজিৎবাবুর কথায় জানা যায়, ‘শুদ্ধ ‘গা’ দিয়ে শুরু করে বা এর উপর বেস করে কত গানের যে সুর করেছি, কিন্তু এমন তো হয়নি, এই গানে প্রতিমাদি তাঁর অদ্ভুত একটা ‘ইনোসেন্ট’ গলায় গান শুরু করতেই সব কিছু যেন একটা অন্য চেহারা নেয়’।  ‘ইনোসেন্ট গলা’ এর চেয়ে ভালো ভাবে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠের ব্যাখ্যা কেউ কোনদিন দিতে পেরেছেন কিনা জানা নেই।  অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে আরও একটি গানের কথা মনে পড়ছে, ‘ওই আকাশে ক্লান্তি নেই’ গানে (১৯৬৩),  গানের কথা লিখেছিলেন অমিয় দাশগুপ্ত।

সুরকার নচিকেতা ঘোষ সুর নিয়ে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করতেন। পুলক

 ইনোসেন্ট ভয়েসের প্রতিমা

বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় ‘মেঘলা ভাঙ্গা রোদ উঠেছে’ গানটিতে এমনভাবে সুর করলেন যেখানে ছন্দের ঝোঁক সব সময় দ্বিতীয় শব্দের উপর পড়ে।   ১৯৫৮ সালের শারদীয় পুজোর উপহার হিসাবে প্রতিমা এই গানটি গাইলেন, এরপর পরবর্তী বছরগুলোতে আমরা পেয়েছি, ‘ছল্কে পড়ে কল্কে ফুলে’ (কথা- প্রবোধ ঘোষ, সুর- অনল চট্টোপাধ্যায়), ‘মন যে খুশী খুশী আজ’(কথা – পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর-রতু মুখোপাধ্যায়), ‘আর তো পারি না সহেলি’ (কথা-মিল্টু ঘোষ, সুর-অনল চট্টোপাধ্যায়), ‘আমি পিয়া হব ছিল সাধ’ (কথা – পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর-রবীন চট্টোপাধ্যায়), ‘তুমি চোখের সামনে ধর পঞ্চমীর চাঁদ’ (কথা – পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর-মান্না দে) ইত্যাদি সব গান আজও সঙ্গীতপ্রেমী শ্রোতাদের মনকে বিশেষভাবে ছুঁয়ে যায়।  তবে আমার একান্ত ব্যাক্তিগতভাবে মনে হয় ‘তুমি চোখের সামনে ধর পঞ্চমীর চাঁদ’ আধুনিক গানটি মান্না দে-র সুরে একমাত্র গান যেটি প্রতিমা গেয়েছিলেন।   ভূপেন হাজারিকার সুরে আরও একটি জনপ্রিয় গান ‘তোমায় কেন লাগছে এতো চেনা’, প্রতিমা এতো সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করেছিলেন যা সেইসময়কার অন্যান্য জনপ্রিয় রোম্যান্টিক গানের মধ্যে অন্যতম স্থান করে নিয়েছিল।  অনেকপরে ১৯৯৭ সালে এই জনপ্রিয় গানটি আবার হিন্দিতে রিমেক করেন গানের সুরকার ভুপেন হাজারিকা। কল্পনা লাজমির ‘দরমিয়ান’ ছবিতে ভূপেনবাবু নিজে হিন্দি ভার্সনটি গেয়েছিলেন এবং সেই সময় বলিউডের প্রথম ১০টি গানের মধ্যে ছিল এই গানটি।  

বাঙ্গালীর মন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো বোধ হয় আর কেউ বুঝতেন না, ফলে যখনই সুর করেছেন সেই গান খুবই পপুলারিটি পেয়েছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘আঁধার আমার ভালো লাগে’ (কথা – মুকুল দত্ত), ‘বড় সাধ জাগে একবার তোমায় দেখি’ (কথা – পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়) এই গানদুটি হৃদয় দিয়ে পরিবেশন  প্রতিমা আর এর সাথে সাথেই হেমন্তবাবুর সঙ্গে প্রতিমার খুব সুন্দর একটা আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। ১৯৫৮ সালে ‘সাহারা’ নামে একটি হিন্দি ছবিতে প্রতিমাকে দিয়ে হিন্দি গান রেকর্ড করেন হেমন্তবাবু। গানটি ছিল মীনাকুমারীর লিপে।  গানটি গেয়ে মুম্বাইতে বেশ প্রশংসা পেয়েছিলেন প্রতিমা।  বেশ কয়েকদিন মুম্বাইতে হেমন্তবাবুর কাছে থাকার পর প্রতিমা কোলকাতায় ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়লেন, কারণ কোলকাতার বাড়ীতে তখন তাঁর দুই শিশুপুত্রকন্যা, অশোক ও রাইকিশোরী।  বাচ্ছাদের টানে, লতা মঙ্গেশকর, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত-এর মতো শিল্পীদের সমস্ত অনুরোধকে পিছনে ফেলে প্রতিমা আবার কোলকাতায় ফিরলেন।  ১৯৬৯ এ ‘প্রসাদ’ পত্রিকার হেমন্তসংখ্যায় প্রতিমা লিখেছিলেন, ‘দুটি গান সুর দিয়েছি,  খুব ইচ্ছে ছিল আমার গানের দাদা, হেমন্তদা সেই দুটি গান রেকর্ড করুক।  আমার ইচ্ছে পূরণ করেছিলেন দাদা অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে । ১৯৫৮ সালে আমার ইচ্ছেকে মর্যাদা দিয়ে দাদা আমার সুরে ও দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের কথায় রেকর্ড করেন দুটি গান, ‘তন্দ্রাহারা রাত ওই জেগে রয়’, ‘শেষের কবিতা মোর দিয়ে যাই আজ’।   ‘গোলাভরা ধানের মতোই হেমন্তর ছিল গলাভরা গান’, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের  এই কথা যেন আরও একবার প্রমান করে দেয় এই গানদুটি শুনলে।    

রেডিও-এর রম্যগীতি অনুষ্ঠানে নিয়মিত শিল্পী ছিলেন প্রতিমা। রেকর্ডে আধুনিক ছাড়াও গেয়েছেন খেয়াল, ঠুংরি, কীর্তন, ভজন, রবীন্দ্রসঙ্গীত, অতুলপ্রসাদ, নজরুলগীতি এবং লালন ফকিরের গান। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ১৯৭৫ সালে এইচ এম ভি থেকে পুজোয় প্রকাশিত একটি বিখ্যাত লালনগীতি, ‘এ বড় আজব কুদরতি’।   ছোটবেলায় রেডিওতে শোনা ‘তুষারমালা ও সাতটি বামনভাই’ গীতিনাট্যে তুষারমালার স্নেহময়ী  মায়ের অসাধারন গীতিকণ্ঠে ছিলেন প্রতিমা।  প্রতিমার সমসাময়িক অন্যান্য শিল্পীবন্ধুদের মধ্যে ছিলেন গায়ত্রী বসু, নির্মলা মিশ্র, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, উৎপলা সেন প্রমুখ । মেয়ে রাইকিশোরীর কথায় জানা যায়, বিভিন্ন শিল্পীর পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্রতিমার সবসময় উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকত।  বিদেশে প্রচুর অনুষ্ঠানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও  বিমানে চড়তে হবে এই ভয়ে প্রচুর অনুষ্ঠান বাতিল করে দিতেন প্রতিমা। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ, হয়তো নাড়ীর টান।    ১৯৮৬ সালে প্রতিমার স্বামী অমিয় বন্দোপাধ্যায় মারা যাবার পর প্রতিমা বড্ড নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। আস্তে আস্তে কমিয়ে দেন সমস্ত রেকর্ডিং।   বছর দশেক তাঁকে জলসায় তেমন আর পাওয়া যায় নি।  এর মাঝে গাথানি থেকে প্রকাশিত একটা ক্যাসেটে প্রতিমা গাইলেন কিছু আধুনিক গান। এরপর নির্মলা মিশ্রের চেষ্টায় ১৯৯৬ সালে রবীন্দ্র সদনে ‘এসোসিয়েশন অব প্রফেশনাল পারফরমিং সিঙ্গারস’ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রতিমা কয়েকটি সঙ্গীত পরিবেশন করেন, তাছাড়া বেশ কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নিলেও তাঁর মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে আরও অসহায় করে তোলে।  শেষের দিকে কাউকে চিনতে পারতেন না প্রতিমা।  ফ্যালফ্যাল করে অসহায়ভাবে শুধু মানুষ চেনার চেষ্টা করতেন।   দিদি প্রতিমার জীবনের

জীবনের অন্তিম লগ্নে প্রতিমা

এই অসহায়তার দিনে নির্মলা মিশ্র সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করতেন।   সময় পেলেই নির্মলা চলে যেতেন প্রতিমার সাহানগরের বাড়ীতে।    খালি গলায় প্রতিমাকে শোনাতেন বিভিন্ন ধরনের গান।   অনেক সময়, প্রতিমার নিজস্ব গান, প্রতিমা সেইসময় ফ্যালফ্যাল করে নির্মলার দিকে তাকিয়ে থাকতেন, হয়তো প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করতেন সেই সব ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। অবশেষে ২৯শে জুলাই, ২০০৪ সালে সমস্ত যন্ত্রণার অবসান।  প্রতিমার ইনোসেন্ট গলার স্বর চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সম্পূর্ণ শিল্পী বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তাই। তাঁর কালজয়ী গানগুলো আজও সমস্ত গানপাগল লোকেদের মনকে টাইমমেশিনে নিয়ে যায় সুদূর অতীতের ফেলে আসা দিনগুলিতে।   প্রতি বছর সঙ্গীতমেলা অথবা দূরদর্শনে রিয়ালিটি শো-তে প্রতিমার গানের ব্রাত্যতা যেন বাংলা সঙ্গীতপ্রেমী মানুষকে বড্ড বেশী পীড়া দেয়।      


 

আমার সোনা চাঁদের কনা


 
 
নাও গান ভরে নাও প্রাণ ভরে 
 
 
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই - প্রথম রেকর্ডিং 
 
 
শেষের কবিতা মোর দিয়ে যাই আজ - প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের সুরে হেমন্তবাবুর গাওয়া একটি দুর্লভ গান
 
 

তথ্যসুত্রঃ- সা রে গা পত্রিকা, গানের প্রতিমা - স্বপন সোম – আনন্দবাজার পত্রিকা, গানের ভুবন - নবপত্রিকা, বাংলা গানের স্বর্ণযুগ – প্রসাদ পত্রিকা, আনন্দধারা – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মনে পড়ে – তপন সিনহা ও গানের সমস্ত লিংক ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত।   

 

প্রবীর মিত্র

২৯/১২/২০২০