This blog will fix on Retro Songs, Films, Photography and other Mixed Bag interesting topic.
আমার কৈফিয়ৎ
খুব ছোট থেকেই ফিল্ম ও মিউজিক আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে তার সাথে পাগলের মতো বিভিন্ন ধরনের গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ পড়ার মারাত্মক নেশা। আমার কিছু ভালো লাগা বিষয় ভাগ করে নেবার জন্য আমার এই পাগলামি।
সময়টা ১৯৫৩ সাল । পুজোর গানের জন্য বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সলিল চৌধুরির কথায় ও সুরে রেকর্ড করলেন দুটি গান । “আমার কিছু মনের আশা” এবং “প্রান্তরের গান আমার” । রেকর্ডিং হয়ে সব কিছু চূড়ান্ত হবার পর, ঠিক গান রিলিজের আগের দিন সলিল চৌধুরির কাছে একটি চিঠি এল । কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখের সঙ্গে জানিয়েছেন যে বিশ্বভারতী পরিচালকমণ্ডলীর নাকি প্রবল আপত্তি আছে তাঁর গাওয়া এই দুটো আধুনিক গান নিয়ে, কারণ কণিকা তখন বিশ্বভারতীর একজন প্রতিষ্ঠিত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী । তাই এই গান রিলিজ করা হলে শিল্পীর কাছে বিশ্বভারতীর দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে । চিঠির শেষে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সলিল চৌধুরির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন ।
উৎপলা
সেন
একটু নিরাশ হলেও আগের সব রেকর্ডিং বাতিল করে দিলেন সলিলবাবু । শেষ পর্যন্ত আবার নতুন উদ্যোগে গান দুটির আবার রেকর্ড হোল শুধু এবার কণিকাদেবীর জায়গায় এলেন গায়িকা উৎপলা সেন । প্রথম গানটি তেমন হিট না হলেও তাঁর গাওয়া ‘প্রান্তরের গান আমার’ আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে । যতদূর জানা যায় কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এই রাবীন্দ্রিক সীমাবদ্ধতার জন্য কোনদিন আধুনিক গান গাইতে পারেন নি ।
সলিল
চৌধুরী
কিছুদিন আগেই সলিল চৌধুরীর ৯৫ তম জন্মদিন উপলক্ষে ‘সলিল চৌধুরী ফাউন্ডেশন অফ মিউজিক’ আয়োজন করেছিল এক বিশেষ ওয়েবিনার ‘প্রান্তরের গান আমার’ । সলিল চৌধুরীর জীবনের নানা কথা, কবিতা ও গান আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন তাঁর পুত্র ও কন্যা অন্তরা, সঞ্চারী ও সঞ্জয় চৌধুরী । এই মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল এই গান দিয়ে, গেয়েছিলেন তাঁর কন্যা অন্তরা চৌধুরী ।
আমার কিছু মনের আশা
প্রান্তরের গান আমার
সলিল চৌধুরীর ৯৫ তম জন্মদিন উপলক্ষে ‘সলিল চৌধুরী ফাউন্ডেশন অফ মিউজিক’ -এর নিবেদন ‘প্রান্তরের গান আমার’
১৯৭৭ সালের ঘটনা, শ্রাবণ মাস, রেডিওতে অথবা শিবরাত্রির
দিনে বিভিন্ন জায়গায় রেকর্ড প্লেয়ারে হঠাৎ বাজতে শুরু করল আরতি মুখোপাধ্যায়ের একটা
সিগনেচার গান ‘বাঁক কাঁধে তুলে, তারকেশ্বরে চলে সতী জয়বাবা বলে, ভাগ্যে তার কি আছে,
জানতে চায় সে বাবার(মহাদেব) কাছে’ ব্যাস সেই
শুরু, তারপর থেকে ছেলে-বুড়ো, মেয়ে-বৌ, সবাই ‘বাবা তারকনাথ’ সিনেমায় দেখা সন্ধ্যা রায়ের
স্টাইলে বাঁক কাঁধে তুলে তারকেশ্বর ট্রেকিং করা শুরু করল ।
বাবা তারকনাথ ছবির রেকর্ডের ফ্রন্ট ইনলে
সবার মনে একটা প্রশ্ন কি
হবে আমার ভবিষ্যৎ ? একমাত্র বাবা বিশ্বনাথের কাছে হয়ত এর উত্তর আছে, তাই অতি কষ্ট করে
পদব্রজে ভক্তরা দলবেঁধে আজও বিশেষ কিছু তিথিতে বাবার কাছে ধর্না দেন।
অথচ মজার কথা ‘বাবা তারকনাথ’ সিনেমাটা রিলিজ হবার আগে পর্যন্ত
কেউ নিজেদের ভবিষ্যৎ-এর মনস্কামনায় বাবার কাছে যাবার এতো ঘটা দেখা যায় নি । ১৯৭৭ সালে রিলিজ হওয়া পরিচালক অর্ধেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের
এই ‘বাবা তারকনাথ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সন্ধ্যা রায়, বিশ্বজিত, অনুপকুমার, গীতা দে,
গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও বোম্বাইয়ের তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুলোচনা চ্যাটার্জি
।মূলত ভক্তিমূলক ছবি হলেও এর জনপ্রিয়তা তৎকালীন
বঙ্গদেশের প্রায় অনেকের মধ্যে একটা ভক্তিভক্তি
রেকর্ডের ব্যাক ইনলে
গদগদভাব জাগাতে সক্ষম হয়েছিল । আমার
মা ছিল বাংলা সিনেমার পোকা । উত্তম-সুচিত্রা অথবা সদ্যরিলিজ হওয়া অনেক সিনেমা দুপুরবেলার
শো-তে মা দেখতে যেত বাবা অথবা আমাদের প্রতিবেশী মাসিমার সঙ্গে । ‘বাবা তারকনাথ’ দেখে
মা একেবারে অভিভূত । পরে মায়ের কাছে এই সিনেমার অলৌকিক কিছু আজব কাণ্ডকারখানার কথা
শুনে আমার মনে হয়েছিল একদিন বাঁক কাঁধে নিয়ে তারকেশ্বরে যাব ঠিক সন্ধ্যা রায়ের স্টাইলে
।অনেক পরে অবশ্য গিয়েছিলাম, তবে বাঁক কাঁধে
নিয়ে নয়, নিছক ঘোরার উদ্দেশ্যে । ছবির গানগুলোও সাঙ্ঘাতিক হিট করেছিল । রেডিওতে প্রত্যেক
সপ্তাহে ছায়াছবির অন্যান্য ছবির গানের পাশাপাশি ‘বাবা তারকনাথ’ সিনেমার একটা গান থাকতোই
। তবে আমার শোনা সব থেকে বেশী বেজেছিল আরতি মুখোপাধ্যায়ের একটা গান ‘বাঁক কাঁধে তুলে’,
মান্না দে-র ‘শিবশম্ভু ত্রিপুরারি’, আশা ভোঁসলের ‘তুমি সূর্য, তুমি চন্দ্র’ আর দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও অংশুমান রায়ের গাওয়া ‘বাঁক কাঁধে চলরে, জয় বাবা বলরে’ ।গানের কথা লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও সুর
দিয়েছিলেন নীতা সেন । অথচ গল্প ছিল অত্যন্ত সাদামাটা, একেবারে পারিবারিক ছবি ।
ভগবানের অস্তিত্ব আছে কি নেই এটাই হোল এই সিনেমার মোদ্দা কথা । ছবির নায়ক বিশ্বজিত
ঘোর নাস্তিক, হিন্দুধর্মের কোনও আচারবিচারের তোয়াক্কা করে না।বাইরের জুতো পরে খাবার ও ঠাকুরঘরে দুমদাম ঢুকে পড়ে
।
বাঁক কাঁধে অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়
নায়িকা সন্ধ্যা রায় আবার ঠিক এর বিপরীত ।সিনেমার গল্পে তিনি খুব ছোট্ট থেকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে শুধু শিবপুজো
করেন আর একদিন শিবলিঙ্গের সামনে বিভোর হয়ে গান গাওয়ার (‘তুমি‘তুমি সূর্য, তুমি চন্দ্র’
– আশা ভোঁসলে) সময় এক বিষধর সাপ তার বিশাল ফনা তুলে ছোবল মারতে ভুলে যায়, এমনই ছিল
সেই গানের ভক্তিরস, যা মানুষ তো কোন ছার একটা অবলা প্রাণীকেও সম্মোহিত করে।তারপর বিভিন্ন আজগুবি ঘটনার মধ্যে দিয়ে নায়িকা সন্ধ্যা
রায় তার নায়ক বিশ্বজিতের মনে ঈশ্বর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে ।ব্রতশক্তি ও পার্বণের মাহাত্ম্য ছবির হিরো অনুভব
করে একেবারে ছবির শেষে । অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায় বেশ কিছু ভক্তিমূলক ছবি করলেও এই 'বাবা তারকনাথ' ছবির মতো আর কোন ছবি তাঁকে এতটা জনপ্রিয়তা দিতে পারেনি বলে মনে হয়। তবে এই ছবির মাধ্যমে গ্রামবাংলার
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা আজগুবি ধারনা জন্মে গিয়েছিল । কোন লোক যদি সাপের কামড়
খায় তাহলে ব্রতশক্তির মাধ্যমে সেই সাপ আবার সেই ব্যাক্তির কাছে ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে
আসে এবং নিজের উগরে দেয়া কড়া বিষ আবার তুলে নেয় নিজের শরীরে ।
সিনেমার সেই আজগুবি দৃশ্য
আজও এই আজগুবি ধ্যানধারনার জন্য গ্রাম বাংলার বহু
মানুষ সাপের কামড়ে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওঝার কাছে নিয়ে যায় আর অপেক্ষা করে কখন সেই
সাপ এসে নিজের বিষ নিয়ে যাবে, যার ফলে প্রাণ হারায় বহু মানুষ ।
এই সিনেমার সাঙ্ঘাতিক জনপ্রিয়তার উপর ভর করে, এই সিনেমার
প্রযোজক কেদারনাথ আগরওয়ালএবার এর হিন্দি ভার্সন
করার জন্য উদ্যোগী হলেন । ইতিমধ্যে ১৯৭৫ সাল নাগাদ এই প্রযোজক ‘জয় সন্তোষী মা’ নামক
একটি বিখ্যাত ভক্তিমূলক ছবির যুক্ত ছিলেন । তাই সেই ছবির জনপ্রিয়তার কথা ভেবে বোম্বাই-এর বিখ্যাত সিনেমা কোম্পানি ‘রাজশ্রী প্রোডাকশন
প্রাইভেট লিমিটেড’ এগিয়ে এল এই ছবির প্রচারে।১৯৮০ সালে ‘রাজশ্রী প্রোডাকশন’ ব্যানারে রিলিজ হল এই সিনেমার হিন্দি ভার্সন
। ছবিতে অভিনেতা অভিনেত্রীরা সবাই এক থাকলেও গানে এল একটা বড় পরিবর্তন ।
বাবা তারকনাথ ছবির হিন্দি রেকর্ডের কভার
বাংলা ছবিতে গান লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার
কিন্তু হিন্দি ছবির জন্য গান লিখলেন বিখ্যাত কবি প্রদীপ ।লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া সেই বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গানটা
মনে আছে ? ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কি লোগো’, ১৯৬৩ সালে রিলিজ হওয়া এই গানের কথা লিখেছিলেন
এই বিখ্যাত হিন্দিভাষী কবি । হিন্দি ভার্সন-এ
গানের সংখ্যাও বেশ কমে গেল,যেখানে বাংলা
সিনেমায় ছিল মোট আটটি গান সেখানে হিন্দি ভার্সন-এ গানের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল মাত্র চারটিতে
।বাংলায় গান গেয়েছিলেন মান্না দে, আরতি মুখোপাধ্যায়,
বনশ্রী সেনগুপ্ত, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও অংশুমান রায় সেখানে হিন্দিতে গাইলেন আরতি
মুখোপাধ্যায় ও ভুপিন্দর সিং । কিন্তু হায়,
গল্প এক হওয়া সত্ত্বেও এবং ‘রাজশ্রী প্রোডাকশন হাউজ' পাশে থাকা সত্ত্বেও হিন্দিভাষী
বাবা তারকনাথ একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল ।হিন্দিভাষী
লোকেরা এই গল্পটা ঠিক নিল না ।
শেষ করার আগে একটা তথ্য দিই । ‘বাবা তারকনাথ’ বাংলা সিনেমার জনপ্রিয়তার
পাশাপাশি ১৯৭৭ সালে আরও একটি রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছিল । পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের
গঠন যা মুখ থুবড়ে পরেছিল সুদীর্ঘ ৩৪ বছর পর ।শোনা যায়, সেই সময় ব্রিগেডে বামফ্রন্ট সমাবেশের চেয়েও কত শতগুন মানুষ উন্মাদের
মতো বাবার ধামে যাত্রা করত চৈত্র থেকে শ্রাবণ মাস। শ্রাবণ মাস আবার বাবা ভোলানাথের
জন্মমাস ও বিয়ের মাস । বলা বাহুল্য এই
১৯৭৭ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিচ্ছেন জ্যোতি বসু
শ্রাবনমাসেই বাবার ধামে সর্বাধিক জনজোয়ারে বামফ্রন্টের
সন্তান থেকে ধরে অন্যান্য সব ডান, আধা ডান-বাম, আঁকাবাঁকা দলের সন্তানগণও সামিল হতে
শুরু করে ।তৎকালীননেতারা বোঝাতে শুরু করেন বাবার কাছে তার সব সন্তানই
সমান, অথবা এই বাবা যেহেতু দাতা-ত্রাতা এবং রাগী বাবা তাই যাবতীয় দলাদল একেবারে তলাতল
। কিছু না হোক – ভোলানাথ ষাঁড় আছে না ! একবার যদি গুঁতিয়ে দেয় তাহলে আর রক্ষা নেই ।তাই সবাই মিলে বল “ভোলে বাবা পার করেগা”।
ছবির সেই বিখ্যাত গান
প্রবীর মিত্র
৩০/১১/২০২০
তথ্যসূত্র ঃ প্রতিদিন-এ প্রকাশিত সন্ধ্যা রায়ের সাক্ষাৎকার, উল্টোরথ ও সমস্ত ছবি ইন্টারনেট ও ইউটিউব হতে প্রাপ্ত।